জন্মকাল এবং পরিচয়ঃ
১৯৪০ সালের ২৮ শে জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের চট্টগ্রামের (বর্তমানে বাংলাদেশ) বাথুরা গ্রামের এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার নয় ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন। তার পিতা হাজী দুলাল মিয়া সওদাগর জুয়েলারী ব্যাবসা করতেন এবং তার মাতা সুফিয়া খাতুন গৃহিণী ছিলেন।
শিক্ষাজীবনঃ
১৯৪৪ সালে তার পরিবার মূল চট্টগ্রাম শহরে চলে আসে। লামাবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন এবং চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে তিনি মেট্রিক পাস করেন।
১৯৫২ সালে শিক্ষাভ্রমণ এর উদ্দেশ্য তিনি ভারত এবং তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান ঘুরে আসেন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক সমাপ্ত করেন এবং সেখানে নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করেন।
১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৬০ সালে বি.এ এবং ১৯৬১ সালে এম.এ সম্পূর্ণ করেন। ১৯৬৫ সালে 'ফুলব্রাইট বিত্তি' নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন এবং ডান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন।
মুক্তিযুদ্ধে অবদানঃ
১৯৭১ সালে তিনি প্রবাসী নাগরিকদের নিয়ে একটি সংগঠন ঘরে তুলেন যুদ্ধে বাংলাদেশকে সহায়তা করার জন্য। তিনি ন্যাশবিলের বাসা থেকে 'বাংলানিউজ লেটার' পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি সেখানে 'বাংলাদেশ তথ্য কেন্দ্র' গড়ে তুলেন এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে অনুরোধ করেন পাকিস্তানীদেরকে সাহায্য না করতে।
কর্মজীবন এবং গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাঃ
১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্বিদ্যালয়ের প্রভাষক নিযুক্ত হওয়ার মধ্যে দিয়ে তার কর্মজীবনের শুরু। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে এলে তিনি নুরুল হক পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হন।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ তার মনে কষ্টের দাগ কাটে। যার ফলে তেভাগা খামার ( তিনটি বাড়ির খামার ) প্রকল্পের উদ্বোধন করেন এবং সরকারের ইনপুট কাজে লিপিবদ্ধ করেন। তবে এ কাজে বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি কাজটি ছেড়ে দেন এবং ১৯৭৬ সালে পুনরায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এ অধ্যাপনা শুরু করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী জোবরা গ্রামে মানুষের মধ্যে বৈষম্যহীনতা এবং ব্যাংকগুলোর দরিদ্র মানুষদের ঋণ দেওয়ার অনিচ্ছা তাকে পীড়া প্রদান করে। পরবর্তীতে, নিজের জমানো টাকা দিয়ে ১৯৮৩ সালের পহেলা অক্টোবর তিনি গ্রামীন ব্যাংক (ভিলেজ ব্যাংক) এর যাত্রা শুরু করেন। তিনি এর প্রথম প্রকল্প হিসেবে ৪২ জন মানুষকে ২৭ ডলার প্রদান করেন।
গ্রামীণ ব্যাংক শুরুর দিকে ফিশিং পুকর এবং সেচ প্রকল্পগুলোতে ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে যা গ্রামীন ফিশারি ফাউন্ডেশন এবং কৃষি ফাউন্ডেশন এ রূপ নেয়। বর্তমানে গ্রামীন গ্রুপের অধীনে গ্রামীন সাইবার নেটওয়ার্ক, গ্রামীণ ফাইভার নেট ফাউন্ডেশন এবং গ্রামীন নিটওয়্যার ফাউন্ডেশন সহ অসংখ্য কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশের বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনে গ্রুপটির ২৫% মালিকানা রয়েছে। তার একান্ত প্রচেষ্টায় গ্রামীণফোনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্ক এর বিস্তার ঘটেছে।
ব্যাক্তিগত জীবনঃ
১৯৬৭ সালে ডান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিয়ান সাহিত্য নিয়ে পড়া ভেরা ফোরস্টেনকোর এর সাথে তার পরিচয় হয়। ১৯৭০ সালে তাদের বিবাহ হয়। কিন্তুু, ১৯৭৯ সালে তাদের প্রথম সন্তান মনিকা ইউনূস জন্মগ্রহণ করার এক মাসের মধ্যেই তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়।
পরবর্তীতে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আফরোজী ইউনূসকে তিনি বিবাহ করেন। পরবর্তীতে আফরোজী ইউনূস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হন।
তার বড় ভাই মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ছিলেন একজন টেলিভিশন উপস্থাপক এবং সমাজকর্মী যিনি ২০১৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার আরেক ভাই মুহাম্মদ ইব্রাহীম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন।
সম্মাননা এবং পুরষ্কারঃ
২০০৬ সালে তিনি এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীন ব্যাংক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার কারণে নরওয়েজিয়ান নোবেল কর্তৃক প্রদত্ত 'শান্তিতে' নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।
এছাড়াও রাষ্ট্রপতি সর্ণপদক, ১৯৮৪ সালে রামোন মাগসেসে পুরষ্কার, ১৯৯৪ সালে বিশ্ব খাদ্য পুরষ্কার, ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক সাইমন বলিভার পুরষ্কার, ১৯৯৮ সালে সিডনি শান্তি পুরষ্কার এবং ২০০৬ সালে সিউল শান্তি পুরষ্কার তার পাওয়া অসংখ্য পুরস্কারের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য। তিনি যুক্তরাষ্টের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা কংগ্রেসনাল মেডেল অফ ফ্রিডম লাভ করেন।
২০০৬ সালে 'টাইম ম্যাগাজিন' তাকে বিশ্বের শীর্ষ ৬০ জন বিজনেস পার্সন এর মধ্যে ১২ তম স্থান দেন এবং ২০০৮ সালে 'বিদেশি পলিসি ম্যাগাজিন' এর তৈরি করা ১০০ জন থিঙ্ক ট্যাঙ্কার্স এর মধ্যে তিনি ২য় স্থান লাভ করেন।
বর্তমানে তিনি জাতিসংঘ, সোয়াব ফাউন্ডেশন, প্রিন্স দ্বিতীয় আলবার্ট মোনাকো ফাউন্ডেশন এবং গ্রামীন ক্রেডিট অগ্রিকোলের বোর্ড কমিটিতে রয়েছেন।
গ্রামীণ ব্যাংক ত্যাগঃ
২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ২০০০ সালেই তার ৬০ বছর পূর্ণ হবার কারণে তাকে ব্যাংকের এমডি পদ থেকে সরে যেতে বলা হয়। তিনি এমডি পদ ছেড়ে দিয়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদের জন্য আবেদন করেন কিন্তুু সরকার তাতে আপত্তি করে। তিনি উচ্চ আদালতে বিষয়টি নিয়ে রুল করলেও তা খারিজ হয়ে যায়। পরবর্তীতে তিনি গ্রামীন ব্যাংক থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন।
তার লেখা কিছু বইঃ
বিল্ডিং সোশাল বিজনেস, ব্যাংকের টু দা পুর, এ ওয়ার্ল্ড অফ থ্রী জিরোস, জিরো এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড জিরো নেট কার্বন ইমিশন, ক্রিয়েটিং এ ওয়ার্ল্ড উইথআউট পোভার্টি।
তার সম্পর্কে অজানা কিছু তথ্যঃ
- ১৯৭৪ সালে যখন তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাশের জোবরা গ্রামে কাজের জন্য যান তখন তিনি জমিদার কর্তৃক হাজারো দরিদ্র মানুষকে নির্যাতিত হতে দেখেন ঋণ পরিশোধ না করতে পারার কারণে। সেই ঘটনা থেকেই তিনি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন।
- তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীন ব্যাংক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এখন পর্যন্ত ৪ কোটি মানুষকে ঋণ প্রদান করেছেন।
- গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ গ্রহণ করি ৯৭% ই হচ্ছেন মহিলা।
- গ্রামীন ব্যাংকের বাংলাদেশে প্রায় ২৬০০ টি শাখা রয়েছে।
- ২০০৭ সালে তিনি আরো কয়েকজন বিশিষ্ট সামাজিক ব্যাক্তিবর্গ মিলে 'নাগরিক শক্তি' নামের একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তুু পরবর্তীতে তা বাতিল হয়ে যায়।
- বিল ক্লিনটন তাকে অর্থনীতিতে নোবেল দেওয়ার জন্য প্রথম থেকেই সোচ্চার ছিলেন কিন্তুু পরবর্তীতে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।
- তিনি ২৬ টি দেশ থেকে ১১৩ টির মতো সম্মানসূচক পুরষ্কার অর্জন করেছেন।
এতক্ষন সময় নিয়ে পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। পোস্টটি ভালো অথবা মন্দ লাগলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন এবং শেয়ার করতে ভুলবেন না।
0 মন্তব্যসমূহ